গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা: কারণ, প্রতিকার ও সহজ ব্যায়াম
গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা হওয়া খুবই কমন একটি সমস্যা। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে অনেক মায়েরা এই সমস্যায় ভোগেন। যদিও এটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের কারণে হয়ে থাকে, তবে কিছু সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে কোমর ব্যথা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথার কারণ
লিগামেন্ট হলো সুতার মতো টিস্যু, যা শরীরের বিভিন্ন হাড় ও জয়েন্টকে (গিরা) একে অপরের সঙ্গে যুক্ত রাখে। গর্ভাবস্থায় শরীর প্রসবের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে গিয়ে এসব লিগামেন্ট নরম ও ঢিলেঢালা হয়ে যায়। এর ফলে কোমর ও কোমরের নিচের অংশের হাড়ের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, যা কোমর ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ।
গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা কমানোর ৯টি কার্যকর টিপস
যদি আপনি গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথায় ভুগে থাকেন, তাহলে নিচের টিপসগুলো কাজে লাগাতে পারেন—
সঠিক ভঙ্গিতে জিনিস তুলুন – মেঝে থেকে কিছু তুলতে হলে হাঁটু ভাঁজ করুন, পিঠ সোজা রাখুন এবং তারপর তুলুন। সামনে ঝুঁকে জিনিস তোলা এড়িয়ে চলুন।
ভারী জিনিস এড়িয়ে চলুন – অতিরিক্ত চাপ শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
সঠিকভাবে শরীর ঘোরান – শরীর ঘোরানোর সময় পুরো শরীর ঘুরিয়ে নিন, শুধু কোমর বা শিরদাঁড়া মোচড় দেবেন না।
উপযুক্ত জুতা পরুন – হিল জুতা না পরে ফ্ল্যাট জুতা পরুন, এতে শরীরের ওজন দুই পায়ে সমানভাবে ভাগ হয়।
সমানভাবে ওজন বহন করুন – কেনাকাটার সময় দুই হাতে ব্যাগের ওজন ভারসাম্যপূর্ণভাবে বহন করুন।
সঠিক ভঙ্গিতে বসুন – অফিস বা ঘরে বসে কাজ করার সময় পিঠ সোজা রাখুন। চাইলে মাতৃত্বকালীন সাপোর্ট পিলো ব্যবহার করতে পারেন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন – বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে বিশ্রামের ওপর বেশি গুরুত্ব দিন।
গরম পানিতে গোসল বা হালকা মালিশ করুন – এতে শরীর রিল্যাক্স হয় এবং ব্যথা কমে।
উপযুক্ত জাজিম বা ম্যাট্রেস ব্যবহার করুন – অতিরিক্ত নরম বিছানা ব্যবহার করবেন না। প্রয়োজনে তোষকের নিচে হার্ডবোর্ড রাখতে পারেন।
প্রয়োজনে, ডাক্তারের অনুমতি সাপেক্ষে প্যারাসিটামল খেতে পারেন। তবে অবশ্যই ওষুধের নির্দেশিকা আগে পড়ে নিতে হবে।
গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা কমানোর ব্যায়াম
এখানে চারটি ধাপে একটি হালকা ব্যায়ামের পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে। এই ব্যায়ামটি পেটের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে। এভাবে এই ব্যায়াম গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ধাপ-১

ছবির মতো চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করুন যেন—
- হাঁটু কোমর বরাবর থাকে
- হাতের তালু কাঁধ বরাবর থাকে
- আঙুলগুলো সামনের দিকে থাকে
- পেটের পেশি টানটান অবস্থায় থাকে
- পিঠ সোজা ও মেঝের সমান্তরালে থাকে
ধাপ-২

এবার ছবির মতো করে—
- পেটের পেশি ভেতরের দিকে টেনে নিন এবং পিঠ ওপরের দিকে উঁচু করুন
- মাথা ও কোমর ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামান
- কনুই নমনীয় রাখুন। কনুই একেবারে সোজা ও শক্ত করে ফেলা যাবে না
- পিঠ কোনো কষ্ট ছাড়া স্বাভাবিকভাবে যতটুকু উঁচু করা যায় ঠিক ততটুকুই উঁচু করবেন
ধাপ-৩

কয়েক সেকেন্ড এ অবস্থানেই থাকুন। এরপর ছবির মতো করে—
- ধীরে ধীরে আগের মতো, অর্থাৎ ধাপ-১ এর ছবির মতো অবস্থানে ফিরে আসুন
- পিঠকে আগের মতো সোজা ও মেঝের সমান্তরালে নিয়ে আসুন
- পিঠ যেন বাঁকা না হয়ে যায় অর্থাৎ নিচের দিকে ঝুঁকে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন
ধাপ -৪
এভাবে ধীরে ধীরে নিয়মিতভাবে মোট ১০ বার ধাপ ১ থেকে ধাপ ৩ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি করুন। পিঠ ওঠানামা করার সময় বিশেষভাবে সতর্ক থাকুন।
কখন ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি
কোমর ব্যথা অনেক বেড়ে গেলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। ডাক্তার আপনাকে ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে পাঠাতে পারেন। ফিজিওথেরাপিস্ট ব্যথা কমানোর বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম দেখিয়ে দিতে পারবেন।
কোমর ব্যথার সাথে যদি নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে তাহলে দেরি না করে ডাক্তার দেখাতে হবে—
- যেকোনো এক পা কিংবা উভয় পায়ে, পায়খানার রাস্তার চারিদিকে অথবা যোনিপথে অবশ লাগা, অর্থাৎ বোধ হারিয়ে ফেলা
- জ্বর আসা, মাসিকের রাস্তা দিয়ে রক্ত যাওয়া ও প্রস্রাব করার সময়ে ব্যথা হওয়া
- বুকের পাঁজরের যেকোনো একপাশে কিংবা উভয় পাশেই ব্যথা হওয়া
গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস পার হয়ে যাওয়ার পরে তীব্র কোমর ব্যথা হলে সেটি সঠিক সময়ের আগেই প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার লক্ষণ হতে পারে। তাই দেরি না করে রোগীকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে।


