সীসা দূষণে বুদ্ধি কমছে শিশুর
সীসা দূষণ বর্তমান সময়ের একটি নীরব ঘাতক, যা শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও স্নায়বিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এই শক্তিশালী নিউরোটক্সিন রক্তে প্রবেশ করে শিশুর মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে। বাংলাদেশে প্রায় ৭০% বুদ্ধিবৃত্তিক অবনতির জন্য দায়ী সীসা দূষণ, অথচ এ বিষয়ে জনসচেতনতা এখনও খুবই কম। এ সমস্যার কারণ, ক্ষতি ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
সীসা কী – উৎস, প্রভাব ও সতর্কতা
সীসা (Lead) একটি প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান ভারী ধাতু, যা সাধারণত পৃথিবীর মাটি, শিলা ও খনিজে পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক উৎসের পাশাপাশি মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও সীসার ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে—যেমন রং, ব্যাটারি, পাইপ, ধাতব পণ্য, এমনকি কিছু প্রাচীন প্রসাধনী সামগ্রীতেও।
যদিও সীসা প্রযুক্তিগতভাবে উপকারী, এর অতিরিক্ত ব্যবহার ও অব্যবস্থাপনা পরিবেশে দূষণ সৃষ্টি করে। এই দূষিত সীসা পানি, বায়ু ও খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ সীসা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে সক্ষম।
সীসা দূষণ কী?
সীসা (Lead) একটি ভারী ধাতু, যা মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সীসার মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি বা শরীরে সীসার অস্বাভাবিকভাবে বেশি পরিমাণ জমে যাওয়াকে সীসা দূষণ বলা হয়। সহজভাবে বললে, শ্বাসপ্রশ্বাস, খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে শরীরে অতিরিক্ত সীসা প্রবেশ করলে একজন ব্যক্তি সীসা দূষণের শিকার হন।
সীসা কীভাবে শরীরে প্রবেশ করে?
সীসা নানা উপায়ে আমাদের শরীরে ঢুকে যেতে পারে—
- সীসাযুক্ত বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করা
- দূষিত খাবার বা পানীয় গ্রহণ করা
- পুরোনো সীসাযুক্ত পাইপ দিয়ে আসা পানি পান করা
- সীসাযুক্ত রং, খেলনা বা পাত্র ব্যবহার করা
💡 সতর্কতা: স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সবসময় সীসা-মুক্ত পাত্র, গুণগত মানসম্পন্ন ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করুন।
সীসা দূষণের কারণে কী ক্ষতি হয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, মানুষের শরীরে সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। অর্থাৎ অল্প পরিমাণ সীসা শরীরে প্রবেশ করলেও তা মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এই দূষণ আমাদের দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, বিশেষ করে মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি এবং হাড়কে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
১. গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে সীসার জমা
সীসা শরীরে প্রবেশ করলে তা মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি ও হাড়ে জমা হয়। এমনকি দাঁতেও অল্প অল্প করে সীসা জমতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
২. গর্ভাবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব
গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে সীসা প্রবেশ করলে তা গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়। এর ফলে রক্তপাত, গর্ভপাত (মিসক্যারেজ) এবং মৃত সন্তানের জন্মের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে।
৩. শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত
সীসা দূষণ শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ধীর করে দেয়। ফলে তারা বয়সের তুলনায় শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
৪. আচরণ ও শেখার ক্ষমতায় প্রভাব
শিশুদের আচরণগত সমস্যার অন্যতম কারণ সীসা দূষণ। এর ফলে শেখার ও পড়াশোনার ক্ষমতা কমে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়, এবং তারা অনেক সময় উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে।
৫. ভাষা ও শ্রবণ সমস্যা
সীসা দূষণ শিশুদের কথা বলার ক্ষমতা ও শ্রবণশক্তি কমিয়ে দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে শিক্ষাজীবন ও সামাজিক যোগাযোগে সমস্যার সৃষ্টি করে।
৬. হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি
শিশু বয়সে সীসা দূষণ হলে বড় হওয়ার পর স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
কোন বয়সী বাচ্চার সীসা দূষণের আশঙ্কা বেশি?
সীসা দূষণ শিশুদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, বিশেষ করে মানসিক বিকাশ ও শেখার ক্ষমতার ওপর এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সীসা দূষণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এর প্রধান কারণ হলো, এই বয়সে তাদের শরীর প্রাপ্তবয়স্ক বা বড় শিশুদের তুলনায় বেশি পরিমাণে সীসা শোষণ করতে সক্ষম।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?
- ৯ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশু: এই বয়সে শিশুরা হামাগুড়ি দেয়, মাটিতে বা ফ্লোরে বেশি সময় কাটায় এবং স্বভাবগত কৌতূহলের কারণে যা পায় তা মুখে দেয়। এতে দূষিত ধুলা, মাটি বা সীসাযুক্ত বস্তু থেকে সীসা শরীরে প্রবেশের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
- ৫ বছরের কম বয়সী শিশু: এই বয়সী বাচ্চারা সবকিছু মুখে নেওয়ার প্রবণতা রাখে, যা সীসা দূষণের আশঙ্কা আরও বাড়ায়।
কেন ছোট শিশুদের ঝুঁকি বেশি?
- তাদের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের বিকাশ এখনো চলমান, ফলে সীসার প্রভাব দ্রুত ও গভীর হয়।
- শরীর ছোট হওয়ায় অল্প পরিমাণ সীসাও বেশি ক্ষতি করতে পারে।
- প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় তাদের সীসা শোষণের হার বেশি।
প্রতিরোধের উপায়
- শিশুর খেলনা, রং, ও বাসার ফ্লোর বা দেয়ালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- দূষিত পানি ও খাবার থেকে বিরত রাখা।
- ঘরের ধুলা ও মাটি নিয়মিত পরিষ্কার করা।
সতর্ক থাকুন — সীসা দূষণ প্রতিরোধযোগ্য, কিন্তু একবার শিশু আক্রান্ত হলে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই প্রাথমিক বয়স থেকেই সচেতনতা জরুরি।
কীভাবে সীসা দূষণ ঘটে: শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি
শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী। তারা আশেপাশে যা পায়, হাতে নেয়, পরীক্ষা করে দেখে— এমনকি মুখে দেয়। এই স্বভাবের কারণে তারা অনেক সময় অজান্তেই ভয়ংকর সীসা দূষণের শিকার হয়। সীসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু, যা শিশুদের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র এবং শারীরিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) জানাচ্ছে, সীসা শরীরে প্রবেশ করতে পারে খাবারের মাধ্যমে, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে, কিংবা ত্বকের সংস্পর্শে এসে।
শিশুদের সীসা দূষণের প্রধান উৎস
১. পুরোনো বিল্ডিংয়ের রং
১৯৭০ সালের আগে নির্মিত অনেক ভবনে সীসাযুক্ত রং ব্যবহার করা হয়েছিল। সময়ের সাথে এই রং খসে পড়ে গুঁড়ো আকারে মাটিতে মিশে যেতে পারে বা বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে।
- শিশু যদি দেয়ালের খসে পড়া রং মুখে দেয়
- সীসাযুক্ত রঙের গুঁড়ো শ্বাসের সাথে গ্রহণ করে
- অথবা সেই মাটি খেলার ছলে মুখে দেয়
তাহলেই সীসা তাদের শরীরে প্রবেশ করে।
২. সীসাদূষিত মাটি
শিল্প এলাকা বা পুরোনো বাড়ির আশেপাশের মাটি অনেক সময় সীসা দূষিত হয়।
- সরাসরি মাটি মুখে দেয়া
- অথবা ওই মাটিতে চাষ করা সবজি খাওয়া
দুইভাবেই সীসা শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
৩. পুরোনো খেলনা, জুয়েলারি ও কসমেটিকস
অনেক পুরোনো প্লাস্টিক খেলনা, শিশুর গহনা বা প্রসাধনীতে সীসা থাকতে পারে। শিশু এগুলো মুখে নিলে সীসা দূষণ ঘটে।
৪. সীসাযুক্ত খাবার পাত্র
অ্যালুমিনিয়াম বা সিরামিকের বাসনপত্র চকচকে করতে অনেক সময় সীসাযুক্ত রং ব্যবহার করা হয়। এসব পাত্রে রান্না বা পরিবেশন করা খাবারে সীসা মিশে যায়।
৫. পুরোনো ট্যাপের পানি
বহু বছরের পুরোনো পানির পাইপে সীসা থাকার ঝুঁকি বেশি। সেই পানি পান করলে শিশু আক্রান্ত হতে পারে।
৬. সীসাযুক্ত খাবার ও পানীয়
কিছু আমদানিকৃত চকলেট, জুস বা অন্যান্য প্যাকেটজাত খাবারেও সীসা থাকতে পারে।
৭. প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার করা সীসাযুক্ত সামগ্রী
শিশুর কাছাকাছি থাকা প্রাপ্তবয়স্ক কেউ যদি সীসাযুক্ত গহনা, কাপড় বা সাজসজ্জার সামগ্রী ব্যবহার করে, তা থেকেও শিশুর দূষণ হতে পারে।
৮. ধুলা ও আসবাবপত্র
সীসা দূষিত ধুলার ছোট কণা পোশাক, আসবাবপত্র বা কার্পেটে জমে থাকলে শ্বাসের মাধ্যমে সীসা শরীরে ঢুকে যায়।
৯. খেলাধুলার পরিবেশ
সীসা আক্রান্ত এলাকায় খেলাধুলা করলে সীসার কণা শিশুর ত্বকে লেগে ত্বকের মাধ্যমেও শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
১০. আয়ুর্বেদিক বা পুরোনো ওষুধ
কিছু আয়ুর্বেদিক বা লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত পুরোনো ওষুধেও সীসা থাকতে পারে, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক।
শিশু সীসা দূষণের শিকার কিনা – কীভাবে বুঝবেন?
সীসা (Lead) একটি ক্ষতিকর ভারী ধাতু, যা শিশুর শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, শিশু সীসা দূষণের শিকার হলে তা অনেক সময় সরাসরি বোঝা যায় না। এমনকি রক্তে সামান্য পরিমাণ সীসা প্রবেশ করলেও শিশুর স্বাস্থ্যে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শিশু সীসা দূষণের সাধারণ লক্ষণ
আপনার শিশুর মধ্যে যদি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন—
- ক্ষুধা কমে যাওয়া।
- সবসময় ক্লান্তি বা অবসন্নতা অনুভব করা।
- মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া।
- শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবে না হওয়া।
- বমিভাব বা বমি।
- কোষ্ঠকাঠিন্য।
- পেট ব্যথা।
- হাড়ে ব্যথা অনুভব করা।
- মাথা ব্যথা।
- পড়াশোনায় অমনোযোগ বা পড়া মনে রাখতে অসুবিধা।
সঠিক পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া জরুরি। ডাক্তার সাধারণত রক্ত পরীক্ষা করে শরীরে সীসার পরিমাণ নির্ণয় করেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায় শিশু সীসা দূষণের শিকার কিনা।
যে-সব শিশু সীসা-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বাস করে—যেমন পুরোনো ভবন, শিল্প এলাকা বা দূষিত পানির সংস্পর্শে থাকে—তাদের ক্ষেত্রে ডাক্তার নিয়মিত চেকআপের সময় রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে পুরোনো ভবনের আশেপাশে বসবাসকারী শিশুদের নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে সীসার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বাংলাদেশের শিশু স্বাস্থ্যে সীসা দূষণের ভয়াবহ প্রভাব
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সীসা দূষণ-আক্রান্ত দেশ—UNICEF এবং PURE EARTH–এর যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ শিশু সীসা দূষণের শিকার, এবং এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি শিশুর রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ১০ মাইক্রোগ্রামের বেশি সীসা বিদ্যমান, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নিরাপদ সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি।
২০২৩ সালে The Lancet–এ প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, শুধু এক বছরেই বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যু সীসা দূষণের কারণে হয়েছে। এর পাশাপাশি, শিশুদের বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় এই দূষণের প্রভাব ভয়াবহ মাত্রায় দেখা যাচ্ছে।
কেন বাংলাদেশের শিশুরা সীসা দূষণের শিকার হয়
- লেড–এসিড ব্যাটারি কারখানা ও রিসাইক্লিং: এসব কারখানায় কর্মরত বা কাছাকাছি এলাকায় বসবাসকারী শিশুরা শ্বাসপ্রশ্বাস ও ত্বকের মাধ্যমে সীসা গ্রহণ করে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে।
- সীসাযুক্ত রঙের ব্যবহার: দাম কম হওয়ায় বাসাবাড়ি, স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালের দেয়ালে সীসা যুক্ত রং ব্যবহার করা হয়। সীসামুক্ত রং বাজারে থাকলেও তা তুলনামূলক দামি হওয়ায় এর ব্যবহার সীমিত।
- ভেজাল মসলা: বিশেষ করে হলুদ ও মরিচের গুঁড়োতে উজ্জ্বল রং আনার জন্য সীসাযুক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা খাবারের মাধ্যমে শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে।
- অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি–পাতিল: নিম্নমানের অ্যালুমিনিয়াম বাসন থেকে রান্নার সময় সীসা খাবারের সাথে মিশে যায়।
- ইলেকট্রনিক বর্জ্য (E-Waste) :নষ্ট ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, খেলনা এবং অন্যান্য গ্যাজেট থেকে সীসা নিঃসৃত হয়ে শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এটি মাটি ও ফসলকেও দূষিত করছে।
- পথশিশুদের ঝুঁকি: শহরের পথশিশুরা প্রায়ই আবর্জনার স্তূপে ধাতব বা প্লাস্টিকজাত জিনিস সংগ্রহ করে। এসব আবর্জনায় সীসার পরিমাণ বিপজ্জনক মাত্রায় থাকে, যা শ্বাসের মাধ্যমে ও ত্বকের সংস্পর্শে শিশুদের দেহে প্রবেশ করে।
- ঘরোয়া ওষুধ ও প্রসাধনী: কিছু আয়ুর্বেদিক ওষুধ, রং ফর্সাকারী ক্রিম এবং সীসাযুক্ত সিঁদুরও শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
শিশুদের উপর সীসা দূষণের প্রভাব
- বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষতি: IQ হ্রাস, শেখার ক্ষমতা কমে যাওয়া।
- আচরণগত সমস্যা: মনোযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত চঞ্চলতা।
- শারীরিক স্বাস্থ্যহানি: শারীরিক বৃদ্ধি ধীর হওয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া।
- সামাজিক প্রভাব: পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, ভবিষ্যতে কর্মক্ষমতা হ্রাস।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক অবনতির প্রায় ৭০%–এর জন্য সীসা দূষণ দায়ী। অর্থাৎ, এই সমস্যার সমাধান না হলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
সমাধানের জন্য করণীয়
- সীসাযুক্ত রং, মসলা ও প্রসাধনীর উপর কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ।
- ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা।
- সীসামুক্ত রান্নার বাসনপত্র ব্যবহার।
- জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও শিশু শ্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ।
- নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ।
সীসা দূষণ যেন না হয় — কার্যকর প্রতিরোধের উপায়
সীসা (Lead) একটি ক্ষতিকর ভারী ধাতু, যা মানুষের দেহে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে নানা ধরনের জটিল এমনকি প্রাণঘাতী রোগের কারণ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও বেশি ভয়াবহ— মানসিক বিকাশে বাধা, শেখার ক্ষমতা হ্রাস এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। সমস্যা হলো, এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না; অনেক সময় পরে লক্ষণ প্রকাশ পায়। তাই আগে থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি।
নিচে সীসা দূষণ প্রতিরোধের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় দেওয়া হলো—
১. পুরোনো রং শনাক্ত ও প্রতিরোধ
- যদি আপনার বাড়ি পুরোনো হয়, দেয়ালে ব্যবহৃত রঙে সীসা আছে কিনা পরীক্ষা করুন।
- যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৮ সালের আগে নির্মিত ভবনের রঙে সাধারণত সীসা থাকে।
- বাচ্চাদের পুরোনো রং স্পর্শ বা খাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।
- পুরোনো বাড়ি হলে সপ্তাহে অন্তত ২ দিন ভালোভাবে ঘর মুছে ফেলুন।
২. নিয়মিত হাত ও নখ পরিষ্কার
- শিশুদের ঘনঘন হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- নিয়মিত নখ কাটুন, যাতে নখের নিচে জমে থাকা ময়লার মাধ্যমে সীসা শরীরে প্রবেশ না করে।
৩. মাটিতে খেলা সীমিত করা
- পুরোনো বাড়ির আশেপাশের মাটিতে বাচ্চাদের খেলতে দেবেন না।
- যদি বাড়ি কলকারখানা বা দূষিত পানির উৎসের কাছে হয়, উঠান বিশুদ্ধ মাটি ও ঘাস দিয়ে ঢেকে রাখুন।
৪. পানি থেকে সীসা দূষণ কমানো
- পুরোনো কল বা পাইপ থাকলে দিনের শুরুতে পানি ব্যবহারের আগে অন্তত ১০ মিনিট কল ছেড়ে রাখুন।
- এতে পানির সাথে থাকা অধিকাংশ সীসা বের হয়ে যাবে।
৫. বাইরে থেকে এসে পরিষ্কার হওয়া
- বাইরে থেকে ফিরে জুতা খুলে ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
- বিশেষ করে সীসা আক্রান্ত এলাকা বা কারখানার আশেপাশে থেকে ফিরলে কাপড় ও জুতা ভালোভাবে ঝেড়ে নিন।
৬. ঝুঁকিপূর্ণ খেলার জায়গা এড়িয়ে চলা
- নাইলন বা পলিইথাইলিনের তৈরি কৃত্রিম টার্ফ মাঠে বাচ্চাদের খেলতে দেবেন না।
- খেলার মাঠে খোলা জায়গায় বসে খাবার বা পানি খাওয়ানো এড়িয়ে চলুন।
৭. পুরোনো খেলনা ও গয়না এড়িয়ে চলা
- বিদেশি পুরোনো খেলনা বা শিশুদের গয়নায় সীসা থাকতে পারে। এগুলো ব্যবহার না করাই ভালো।
৮. রান্নার পাত্রে সতর্কতা
- পুরোনো বাসন বা চকচকে সিরামিক পাত্রে সীসা থাকতে পারে।
- সবচেয়ে নিরাপদ হলো লোহা বা স্টিলের তৈরি পাত্রে রান্না করা।
৯. পুষ্টিকর খাবারের মাধ্যমে সুরক্ষা
- আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার সীসা শরীর থেকে বের করতে সহায়তা করে।
- নিয়মিত ডিম, মাংস, শিমের বীজ, টকদই, পনির, লেবু, সবুজ মটরশুঁটি ও ফলমূল খাওয়ান।


