শিশুর রক্তস্বল্পতা (এনিমিয়া)

child-anemia-awareness-bangla

শিশুদের রক্তস্বল্পতা (এনিমিয়া) কারণ, লক্ষণ, ক্ষতি ও প্রতিরোধের উপায়

শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা বা এনিমিয়া বর্তমানে একটি খুবই সাধারণ সমস্যা। অনেক সময় শিশুর রক্ত পরীক্ষা করলে দেখা যায় তার হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। বিষয়টি শুধু রক্তের সমস্যা নয়, এটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশের অনেক শিশুই আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ শতাংশেরও বেশি শিশু কোনো না কোনো ধরনের এনিমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রক্তস্বল্পতা (এনিমিয়া) কী?

রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক মাত্রার নিচে নেমে গেলে তাকে রক্তস্বল্পতা বা এনিমিয়া বলা হয়। হিমোগ্লোবিন হলো রক্তের এমন একটি উপাদান যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।

শিশুদের স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন মাত্রা

বয়সস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন (g/dL)
৬ মাস – ৫ বছর১১ বা তার বেশি
৫ – ১১ বছর১১.৫ বা তার বেশি
১১ – ১৫ বছর১২ বা তার বেশি

এই মাত্রার নিচে হিমোগ্লোবিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

 

শিশুদের রক্তস্বল্পতা কী কী ক্ষতি করে?

রক্তস্বল্পতা শুধু দুর্বলতা তৈরি করে না, বরং শিশুর সামগ্রিক বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

রক্তস্বল্পতার কারণে—

  • মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে

  • শেখার ক্ষমতা ও মনোযোগ কমে যেতে পারে

  • বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ধীর হয়ে যেতে পারে

  • শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে

  • শিশুর কর্মক্ষমতা ও খেলাধুলার আগ্রহ কমে যেতে পারে

দীর্ঘদিন চিকিৎসাবিহীন রক্তস্বল্পতা ভবিষ্যতে শিশুর স্বাস্থ্য ও বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

শিশুদের রক্তস্বল্পতার লক্ষণ

প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। তবে রক্তস্বল্পতা বাড়লে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে—

  • মুখমণ্ডল ফ্যাকাসে দেখানো

  • চোখের ভেতরের পাতা সাদা হয়ে যাওয়া

  • দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া

  • অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া

  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া

  • খিটখিটে মেজাজ

  • মনোযোগের ঘাটতি

  • ক্ষুধামন্দা

  • বারবার অসুস্থ হওয়া

  • অতিরিক্ত চুল পড়া

  • নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া

  • ঠোঁটের কোণে ঘা হওয়া

  • মাটি, চুন, ছাই বা অখাদ্য জিনিস খেতে চাওয়া (পিকা)

 

শিশুদের রক্তস্বল্পতার সাধারণ কারণ

রক্তস্বল্পতার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

  • আয়রনের ঘাটতি

  • কৃমি সংক্রমণ

  • থ্যালাসেমিয়া

  • ফলিক অ্যাসিডের অভাব

  • ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতি

  • পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়া

  • প্রি-টার্ম বা সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশু

  • এক বছরের আগে গরুর দুধ দেওয়া

  • ভিটামিন সি-এর অভাব

  • দীর্ঘদিনের রক্তক্ষরণ

  • কিছু জন্মগত বা রক্তের রোগ

 

কেন অনেক শিশুর আয়রনের ঘাটতি হয়?

৬ মাস বয়সের পর শিশুর শরীরে জমা থাকা আয়রনের মজুত ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। তখন বুকের দুধের পাশাপাশি পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার প্রয়োজন হয়।

কিন্তু অনেক পরিবারে শিশুকে প্রতিদিন একই ধরনের খাবার যেমন-

  • শুধু খিচুড়ি

  • শুধু সুজি

  • শুধু ভাত বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার

দেওয়া হয়।

এসব খাবার শিশুর পেট ভরালেও পর্যাপ্ত আয়রন, প্রোটিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়ে।

 

শিশুর খাবারে বৈচিত্র্য কেন জরুরি?

শিশুরা প্রতিদিন একই খাবার খেতে পছন্দ করে না। তাই খাবারে বৈচিত্র্য রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর খাদ্যতালিকায় পর্যায়ক্রমে রাখতে পারেন—

  • মাছ

  • মাংস

  • ডিম

  • ডাল

  • শাকসবজি

  • ফলমূল

  • বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক খাবার

একই খাবার প্রতিদিন না দিয়ে পরিবর্তন করে দিলে শিশু খাবারের প্রতি আগ্রহী থাকে।

 

ফ্যামিলি ফুড বা পারিবারিক খাবার কেন ভালো?

বিশেষজ্ঞরা শিশুদের জন্য শুধুমাত্র আলাদা ফর্মুলা খাবারের ওপর নির্ভর না করে পরিবারের খাবারের সঙ্গে পরিচিত করানোর পরামর্শ দেন।

ফ্যামিলি ফুড বলতে বোঝায়—

পরিবারের সবাই যা খাচ্ছে, বয়স অনুযায়ী সেটি সামান্য পরিবর্তন করে শিশুকেও দেওয়া।

যেমন-

  • কম ঝাল মাংস

  • মাছ

  • ডাল

  • ভাত

  • সবজি

এভাবে খাওয়ালে শিশু নতুন স্বাদ গ্রহণ করতে শেখে এবং পুষ্টির ঘাটতি হওয়ার ঝুঁকি কমে।

 

শিশুকে জোর করে খাওয়ানো কি ঠিক?

না। জোর করে খাওয়ানো শিশুর মধ্যে খাবারের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি করতে পারে।

কী করবেন?

  • শিশুকে খেতে উৎসাহ দিন

  • পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেতে বসুন

  • শিশুকে নিজের প্লেট দিন

  • তাকে নিজে খাওয়ার সুযোগ দিন

  • খাবার নিয়ে চাপ সৃষ্টি করবেন না

শিশুরা বড়দের অনুকরণ করতে ভালোবাসে। তাই বাবা-মাকে খেতে দেখলে অনেক সময় তারাও আগ্রহ নিয়ে খেতে শুরু করে।

 

আয়রনসমৃদ্ধ খাবার

  প্রাণিজ উৎস (হিম আয়রন)

  • গরুর মাংস

  • খাসির মাংস

  • মুরগির মাংস

  • কলিজা

  • সামুদ্রিক মাছ

  • ডিমের কুসুম

  উদ্ভিজ্জ উৎস (নন-হিম আয়রন)

  • মসুর ডাল

  • ছোলা

  • লাল আটা

  • পালং শাক

  • ব্রকলি

  • বাঁধাকপি

  • টমেটো

  • খেজুর

  • কিসমিস

  • বিভিন্ন বাদাম

 

ভিটামিন সি কেন প্রয়োজন?

খাবার থেকে আয়রন ভালোভাবে শোষিত হওয়ার জন্য ভিটামিন সি প্রয়োজন।

  ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার

  • পেয়ারা

  • কমলা

  • আমলকি

  • পেঁপে

  • আনারস

  • আম

  • টমেটো

  • ক্যাপসিকাম

  • ফুলকপি

  • ব্রকলি

 

কৃমি সংক্রমণ ও রক্তস্বল্পতা

কৃমি শিশুদের রক্তস্বল্পতার অন্যতম কারণ।

কৃমি হলে দেখা যেতে পারে—

  • ওজন কমে যাওয়া

  • পেটে ব্যথা

  • বমি ভাব

  • খিটখিটে মেজাজ

  • মলদ্বারে চুলকানি

  • ঘুমের সমস্যা

রক্তস্বল্পতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমি সংক্রমণ আছে কি না তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

 

রক্তস্বল্পতা নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

রক্তস্বল্পতা নিশ্চিত করতে সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়—

প্রধান পরীক্ষা

  • CBC with PBF

প্রয়োজন অনুযায়ী

  • Serum Iron

  • Ferritin

  • Vitamin B12

  • Folate

  • Hb Electrophoresis

 

শিশুদের রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা

চিকিৎসা শুরু করার আগে রক্তস্বল্পতার কারণ নির্ণয় করা জরুরি।

রক্ত পরীক্ষার ফলাফল দেখে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী-

  • আয়রন সাপ্লিমেন্ট

  • ফলিক অ্যাসিড

  • ভিটামিন বি-১২

  • কৃমির ওষুধ

  • অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা

নির্ধারণ করেন।

অনেক ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসার মাধ্যমে দ্রুত উন্নতি হতে পারে।

 

শিশুদের রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে করণীয়

  •  ৬ মাস বয়সের পর পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার শুরু করুন
  •  প্রতিদিন একই খাবার না দিয়ে বৈচিত্র্য আনুন
  •  আয়রনসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত দিন
  •  ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি খাওয়ান
  •  শিশুকে জোর করে খাওয়াবেন না
  • পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন
  •  নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান
  •  চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করুন

শিশুদের রক্তস্বল্পতা একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। সময়মতো শনাক্ত করা গেলে এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুললে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শিশুর সুস্থ শারীরিক বৃদ্ধি, মেধার বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে আয়রনসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের বিকল্প নেই।