গর্ভাবস্থার ৬ষ্ঠ সপ্তাহ​

pregnancy-week-6

গর্ভাবস্থার ৬ষ্ঠ সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার ৬ষ্ঠ সপ্তাহে আপনাকে স্বাগতম। এই সময় হয়তো বাইরে থেকে এখনো গর্ভবতী মনে না হলেও, আপনার শরীরের ভেতরে প্রতিদিনই ঘটছে অসাধারণ পরিবর্তন। ছোট্ট শিশুর হৃদপিণ্ড স্পন্দন শুরু করেছে, চোখ, কান ও হাত-পায়ের প্রাথমিক গঠন তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মায়ের শরীরেও হরমোনের পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন শারীরিক ও মানসিক অনুভূতি দেখা দিতে পারে।

এই লেখায় জানবেন-

  • ৬ সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি

  • মায়ের শরীরে কী পরিবর্তন হয়

  • কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে

  • কী কী করণীয়

  • বাবার ভূমিকা

  • প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ

৬ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা এক নজরে
গর্ভকাল
৬ সপ্তাহ
মাস
১ মাস ২ সপ্তাহ
ত্রৈমাসিক
প্রথম ত্রৈমাসিক
বাকি সময়
৩৪ সপ্তাহ
শিশুর দৈর্ঘ্য
প্রায় ৬ মিমি
শিশুর আকার
একটি মসুর ডালের সমান

এই সপ্তাহে আপনার করণীয়

নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন

যদি আগে ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকে, তাহলে এখন থেকেই ধীরে ধীরে শুরু করুন। নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম-

পরামর্শ: প্রথমে ১০ মিনিট স্বাভাবিকভাবে হাঁটুন। এরপর ৫ মিনিট একটু দ্রুত হাঁটুন। কয়েকদিন পর ধীরে ধীরে সময় বাড়িয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটার লক্ষ্য রাখুন।

গর্ভকালীন সব রিপোর্ট ও কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন

ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট, রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট এবং গর্ভকালীন চেকআপের কার্ড একটি ফাইলে গুছিয়ে রাখুন।

জরুরি সময়ে এগুলো খুব কাজে লাগবে।

স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন

গর্ভাবস্থায় অনেক সময় হঠাৎ কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেতে খুব ইচ্ছা হতে পারে।

যদি মিষ্টি বা জাঙ্ক ফুড খেতে ইচ্ছা হয়, তাহলে তার পরিবর্তে—

  • মৌসুমি ফল
  • দই
  • বাদাম
  • স্বাস্থ্যকর ঘরে তৈরি খাবার

বেছে নেওয়ার চেষ্টা করুন।

আয়রন–ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খাওয়া শুরু করুন

যদি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এখনো শুরু না করে থাকেন, তাহলে আজ থেকেই নিয়মিত আয়রন–ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খাওয়া শুরু করুন।

এর উপকারিতা—

  • রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সাহায্য করে
  • শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ
  • কম ওজনের শিশু জন্মানোর ঝুঁকি কমাতে সহায়ক

গর্ভাবস্থার ৬ষ্ঠ সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি

গর্ভাবস্থার ৬ষ্ঠ সপ্তাহ

এই সময় আপনার শিশুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ মিলিমিটার।

অর্থাৎ সে এখন প্রায় একটি মসুর ডালের সমান।

যদিও আকারে খুব ছোট, কিন্তু প্রতিদিনই তার শরীরে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।

শিশুর হৃদপিণ্ড স্পন্দন শুরু করেছে

৬ সপ্তাহে শিশুর ছোট্ট হৃদপিণ্ড কাজ শুরু করে।

কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ড করলে হৃদস্পন্দন দেখা বা শোনা যেতে পারে।

চোখ ও কান তৈরি হচ্ছে

এই সপ্তাহে শিশুর মুখমণ্ডল ধীরে ধীরে গঠন হচ্ছে।

  • চোখের প্রাথমিক অংশ তৈরি হচ্ছে।
  • মাথার দুই পাশে ছোট অংশ থেকে কান গড়ে উঠছে।

হাত-পা তৈরি হতে শুরু করেছে

এ সপ্তাহের শেষ দিকে শরীরের দুই পাশে ছোট ছোট অংশ দেখা যায়।

পরবর্তীতে এগুলোই পূর্ণাঙ্গ হাত ও পায়ে পরিণত হবে।

ছোট্ট লেজের মতো অংশ দেখা যেতে পারে

এই সময় শিশুকে কিছুটা ব্যাঙাচির মতো দেখতে লাগতে পারে।

এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই অংশটি মিলিয়ে যায়।

মায়ের শরীরে যে সব পরিবর্তন ঘটে

গর্ভের শিশুর দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আপনার শরীরে হরমোনের মাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হয়।

এই পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

গন্ধের প্রতি সংবেদনশীলতা বেড়ে যেতে পারে

আগের তুলনায় রান্না, সুগন্ধি কিংবা বিভিন্ন গন্ধ অনেক বেশি তীব্র মনে হতে পারে। এর সঙ্গে বমি বমি ভাবও বাড়তে পারে।

অস্বস্তি কমানোর উপায়

  • ঘরের জানালা খুলে রাখুন
  • পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন
  • লেবু, আদা বা পুদিনার গন্ধ অনেকের জন্য আরামদায়ক হতে পারে

খাবারের রুচিতে পরিবর্তন

হঠাৎ কোনো খাবার খুব খেতে ইচ্ছা করতে পারে। আবার আগে যেটা পছন্দ ছিল, সেটাই ভালো নাও লাগতে পারে।

যা করতে পারেন

  • একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খান।
  • দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকবেন না।
  • স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন।

৬ সপ্তাহে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে

সব মায়ের একই লক্ষণ নাও থাকতে পারে।

এই সময় সাধারণত দেখা যায়-

  • ক্লান্ত লাগা
  • বমি বমি ভাব বা বমি
  • ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
  • স্তনে ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা
  • মাথাব্যথা
  • মুড সুইং
  • মুখে ধাতব স্বাদ
  • পেট ফাঁপা
  • সাদা স্রাব কিছুটা বেড়ে যাওয়া
  • তলপেটে হালকা টান বা মাসিকের মতো ব্যথা

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন-

  • যোনিপথ দিয়ে রক্তপাত
  • তীব্র পেটব্যথা
  • অস্বাভাবিক জ্বর
  • অতিরিক্ত দুর্বলতা
  • বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতি

বাবার করণীয়

গর্ভাবস্থার এই সময়ে বাবার সহযোগিতা মায়ের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

আয়রন–ফলিক অ্যাসিড খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিন

প্রতিদিন একই সময়ে খাওয়ার জন্য মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করতে পারেন।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখুন

সব রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন এবং চেকআপ কার্ড একটি ফাইলে রাখুন।

স্বাস্থ্যকর খাবার কিনে রাখুন

মায়ের পছন্দের স্বাস্থ্যকর খাবার আগে থেকেই ঘরে রাখুন।

যেমন-

  • ফল
  • দই
  • বাদাম
  • সবজি
  • দুধ

রান্নার কাজে সাহায্য করুন

এসময় অনেক হবু মায়েরই রান্নার গন্ধে যদি অস্বস্তি হয়, তাই  কিছুদিন রান্নার দায়িত্ব ভাগ করে নিন। এতে মায়ের শারীরিক ও মানসিক চাপ অনেকটাই কমে।

হবু মায়েদের জন্য স্বাস্থ্য পরামর্শ

সাধারণ জিজ্ঞাসা

৬ সপ্তাহে শিশুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ মিলিমিটার, অর্থাৎ প্রায় একটি মসুর ডালের সমান।

 

হ্যাঁ। ৫ থেকে ৬ সপ্তাহের শিশুর হার্টবিট চলে আসে। কিছু ক্ষেত্রে আলট্রাসাউন্ডে তা দেখা যেতে পারে।

 

হ্যাঁ। অনেক গর্ভবতী মায়ের এই সময় বমি বমি ভাব, খাবারের রুচিতে পরিবর্তন এবং গন্ধের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখা দেয়।

 

চিকিৎসক যদি কোনো নিষেধ না দিয়ে থাকেন, তাহলে হালকা হাঁটা ও গর্ভাবস্থার উপযোগী ব্যায়াম সাধারণত নিরাপদ। নতুন করে ব্যায়াম শুরু করলে ধীরে ধীরে শুরু করুন।