গর্ভাবস্থার ৭ম সপ্তাহ​

গর্ভাবস্থার ৭ম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি - Parenting Point

গর্ভাবস্থার ৭ম সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার ৭ম সপ্তাহে আপনাকে স্বাগতম। এই সময় হয়তো বাইরে থেকে এখনো গর্ভবতী মনে না হলেও, আপনার গর্ভের ছোট্ট শিশুটি প্রতিদিন দ্রুত বেড়ে উঠছে। তার মস্তিষ্ক, চোখ, কান, মুখমণ্ডল এবং হাত-পায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মায়ের শরীরেও নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বেশি পিপাসা লাগা, বমিভাব, মুড সুইং বা খাবারের রুচিতে পরিবর্তন এ সময়ের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা।

এই লেখাটি পড়ে যা জানতে পারবেন-

  • ৭ সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি
  • মায়ের শরীরে কী পরিবর্তন হয়
  • এই সপ্তাহে কী কী করণীয়
  • সাধারণ লক্ষণ
  • বাবার ভূমিকা
  • প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ
৭ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা এক নজরে
গর্ভকাল
৭ সপ্তাহ
মাস
১ মাস ৩ সপ্তাহ
ত্রৈমাসিক
প্রথম ত্রৈমাসিক
বাকি সময়
৩৩ সপ্তাহ
শিশুর দৈর্ঘ্য
প্রায় ১০ মিমি
শিশুর আকার
একটি মুড়ির সমান

এই সপ্তাহে আপনার করণীয়

সাদা চালের বদলে লাল চাল ও লাল আটা বেছে নিন

এই সপ্তাহ থেকে খাবারের তালিকায় ধীরে ধীরে লাল চাল ও লাল আটা যোগ করার চেষ্টা করুন। লাল চাল ও লাল আটায় থাকে বেশি ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ায়, যা মা ও গর্ভের শিশুর জন্য উপকারী। একদিনেই পুরো পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস করুন। প্রথমে সাদা চালের সঙ্গে কিছুটা লাল চাল মিশিয়ে রান্না করতে পারেন। একইভাবে সাদা আটার সঙ্গে লাল আটা মিশিয়েও রুটি তৈরি করা যায়।

প্রতিদিন ২–৩ লিটার পানি পান করুন

গর্ভাবস্থায় শরীরে রক্তের পরিমাণ বাড়তে থাকে। তাই এই সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অন্তত ২ থেকে ৩ লিটার বা ৮–১২ গ্লাস পানি পান করার চেষ্টা করুন। পানি শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে, হজম ভালো রাখে এবং গর্ভের শিশুকে ঘিরে থাকা অ্যামনিওটিক ফ্লুইড তৈরিতে সহায়তা করে। যদি বমিভাব থাকে, তাহলে একসঙ্গে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করুন।

আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খাওয়া চালিয়ে যান

আপনার চিকিৎসক যদি আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খেতে বলে থাকেন, তাহলে নিয়মিত খাওয়া চালিয়ে যান। আয়রন-ফলিক অ্যাসিড রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সাহায্য করে, শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ এবং মা ও শিশুর সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।

গর্ভাবস্থার ৭ম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি

গর্ভাবস্থার ৭ম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি - Parenting Point

এ সপ্তাহে আপনার গর্ভের ছোট্ট শিশুটি প্রায় ১০ মিলিমিটার লম্বা হয়েছে। অর্থাৎ তার আকার এখন প্রায় একটি মুড়ির সমান। যদিও সে এখনো খুব ছোট, কিন্তু প্রতিদিন তার শরীরে নতুন নতুন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে।

শিশুর মাথা দ্রুত বড় হচ্ছে

এই সময় শিশুর মস্তিষ্ক খুব দ্রুত বিকশিত হয়। তাই শরীরের তুলনায় তার মাথা কিছুটা বড় দেখায়। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সুস্থ বিকাশেরই অংশ।

চোখ, কান ও নাকের গঠন আরও স্পষ্ট হচ্ছে

৭ সপ্তাহে শিশুর মুখমণ্ডল ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করে। এই সময় শিশুর চোখের লেন্স তৈরি হতে থাকে, কানের ভেতরের অংশ গঠন শুরু হয় এবং নাকের প্রাথমিক আকৃতি তৈরি হতে থাকে। প্রতিদিন শিশুর মুখমণ্ডলের গঠন আরও স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ হতে থাকে।

হাত-পা আরও বড় হচ্ছে

এ সপ্তাহে শিশুর হাত ও পা আগের তুলনায় আরও লম্বা হতে শুরু করে। হাত-পায়ের ভেতরে নরম তরুণাস্থি (কার্টিলেজ) তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তীতে শক্ত হাড়ে পরিণত হবে। এখনো আঙুল পুরোপুরি আলাদা না হলেও ধীরে ধীরে তার আকৃতি তৈরি হচ্ছে।

শিশুর শরীরের আকৃতিতে পরিবর্তন

আগের সপ্তাহের তুলনায় শিশুর শরীর এখন আরও বাঁকানো। গর্ভের ভেতরে সে ইংরেজি “C” অক্ষরের মতো অবস্থান করে। এটি এই সময়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশেরও একটি অংশ।

মায়ের শরীরে যে সব পরিবর্তন ঘটে

এই সময় আপনার শরীর শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে দ্রুত মানিয়ে নিতে থাকে। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন নতুন অনুভূতি দেখা দিতে পারে।

শরীরে রক্তের পরিমাণ বাড়ছে

গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই শরীরে রক্তের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এই অতিরিক্ত রক্ত গর্ভের শিশুর কাছে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়, প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে এবং শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। এই কারণেই অনেকের বেশি পিপাসা লাগে।

বেশি পিপাসা লাগা স্বাভাবিক

আপনি হয়তো আগের তুলনায় অনেক বেশি পানি খেতে চাইছেন। এটি একদম স্বাভাবিক। তবে পিপাসা পেলেই কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত মিষ্টি পানি পান করবেন না। বিশুদ্ধ পানি পান করার চেষ্টা করুন।

লাল চাল ও লাল আটা কেন ভালো?

আমাদের দেশের অনেক পরিবারেই প্রতিদিন সাদা চাল ও সাদা আটা ব্যবহার করা হয়। তবে গর্ভাবস্থায় সম্ভব হলে ধীরে ধীরে লাল চাল ও লাল আটার ব্যবহার শুরু করুন।

লাল চাল ও লাল আটার উপকারিতা—

  • বেশি ফাইবার থাকে
  • দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে
  • রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়
  • হজম ভালো রাখতে সাহায্য করে

তবে হঠাৎ করে পুরো খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস করুন।

মুড সুইং

এই সময় কখনো খুব ভালো লাগতে পারে, আবার সামান্য কারণেও মন খারাপ হতে পারে। হঠাৎ কান্না চলে আসা, আবেগপ্রবণ হয়ে যাওয়া বা অস্থির লাগা এসব গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক পরিবর্তনের অংশ। নিজেকে দোষ দেবেন না। যদি দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ থাকে, কোনো কাজেই আগ্রহ না থাকে বা উদ্বেগ খুব বেশি হয়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

বিস্তারিত জানতে আমাদের “গর্ভাবস্থায় মুড সুইং কেন হয়, কী করবেন এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন” লেখাটি পড়ুন।

জরায়ুর আকার ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে

গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি অনুযায়ী জরায়ুও ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করে। অনেকের ক্ষেত্রে জরায়ুর আকার একটি ছোট কমলার কাছাকাছি হতে পারে, তবে এটি সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। আপনি হয়তো লক্ষ্য করবেন, আগের মতো জামাকাপড় আরামদায়ক লাগছে না বা কোমরের অংশে সামান্য টান অনুভব হচ্ছে। তবে এখনো বাইরে থেকে আপনার গর্ভাবস্থার বিষয়টি বোঝা যাবে না। 

৭ সপ্তাহে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে

গর্ভাবস্থার ৭ম সপ্তাহে প্রত্যেক মায়ের অভিজ্ঞতা একরকম নাও হতে পারে। কারও লক্ষণ বেশি হতে পারে, আবার কারও খুব কমও হতে পারে। দুটোই স্বাভাবিক। এই সপ্তাহে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে—

  • অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা
  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
  • খাবারের রুচিতে পরিবর্তন
  • কিছু খাবারের প্রতি তীব্র আগ্রহ বা অরুচি
  • নির্দিষ্ট গন্ধে অস্বস্তি বা বমি বমি ভাব
  • ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
  • স্তনে ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা
  • মাথাব্যথা
  • মুড সুইং বা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া
  • মুখে ধাতব স্বাদ লাগা
  • পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি
  • সাদা স্রাব কিছুটা বেড়ে যাওয়া
  • তলপেটে হালকা টান বা মাসিকের মতো ব্যথা
  • মুখে মেছতার মতো হালকা বাদামি দাগ দেখা দেওয়া
  • চুল আগের তুলনায় ঘন বা উজ্জ্বল মনে হওয়া

এসব পরিবর্তনের বেশিরভাগই হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হয় এবং সাধারণত চিন্তার কারণ নয়।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

গর্ভাবস্থায় কিছু লক্ষণ স্বাভাবিক হলেও কিছু লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়। নিচের যেকোনো সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—

  • যোনিপথ দিয়ে রক্তপাত
  • তীব্র বা অসহনীয় পেটব্যথা
  • জ্বর
  • বারবার বমি হয়ে পানি পর্যন্ত রাখতে না পারা
  • অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা মাথা ঘোরা
  • দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব
  • তীব্র পানিশূন্যতার লক্ষণ

গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না।

বাবার করণীয়

গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই বাবার সহযোগিতা মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রতিদিন পানি খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিন

অনেক সময় বমিভাব বা ব্যস্ততার কারণে পর্যাপ্ত পানি খাওয়া হয় না। আপনি একটি পানির বোতল ভরে সঙ্গীর হাতের কাছে রাখুন এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে পানি খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিন।

পরিবারের সবার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা করুন

শুধু গর্ভবতী মায়ের জন্য আলাদা খাবার তৈরি করার বদলে পুরো পরিবারের খাদ্যতালিকায় ধীরে ধীরে লাল চাল ও লাল আটা যোগ করতে পারেন। এতে সবারই উপকার হবে এবং আলাদা রান্নার ঝামেলাও কমবে। আপনি বাজার করার সময় নিয়মিত লাল চাল, লাল আটা, ফল, সবজি, ডাল, দুধ কেনার চেষ্টা করুন।

মানসিকভাবে পাশে থাকুন

এই সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে আপনার সঙ্গী আগের তুলনায় বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে পারেন। তিনি হয়তো সহজেই মন খারাপ করতে পারেন, হঠাৎ কেঁদে ফেলতে পারেন কিংবা অকারণ দুশ্চিন্তা করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে তার অনুভূতিগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। অনেক সময় শুধু পাশে বসে কথা শোনাও বড় একটি মানসিক সাপোর্ট।

ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামলান

ছোটখাটো বিষয়ে মতের অমিল বা কথা কাটাকাটি হতে পারে। সেই সময় রাগ না করে শান্তভাবে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, এই সময় আপনার ধৈর্য এবং সহযোগিতা মায়ের মানসিক স্বস্তি বাড়াতে সাহায্য করে।

হবু মায়েদের জন্য স্বাস্থ্য পরামর্শ

সাধারণ জিজ্ঞাসা

৭ সপ্তাহে গর্ভের শিশুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ মিলিমিটার, অর্থাৎ প্রায় একটি মুড়ির সমান।

 

এই সময় শিশুর মস্তিষ্ক খুব দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। তাই শরীরের তুলনায় মাথা কিছুটা বড় দেখাতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে এবং গর্ভের শিশুকে ঘিরে থাকা অ্যামনিওটিক ফ্লুইড তৈরিতে সাহায্য করে।


 

হ্যাঁ। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেকেরই এই সময় মন খারাপ, আবেগপ্রবণতা বা মুড সুইং হতে পারে।

বাইরে থেকে দেখে পেট বড় বা গর্ভাবস্থা বোঝা যায় না। তবে যাদের আগে সন্তান হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা আগে বোঝা যেতে পারে।