গর্ভাবস্থার ৯ম সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার ৯ম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি - Parenting Point

গর্ভাবস্থার ৯ম সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার ৯ম সপ্তাহে আপনাকে স্বাগতম। আপনার গর্ভধারণের এখন প্রায় ২ মাস ১ সপ্তাহ চলছে। এ সময় আপনার গর্ভের ছোট্ট শিশুটি দ্রুত বেড়ে উঠছে এবং তার শরীরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আরও পরিপূর্ণভাবে গঠিত হচ্ছে। চোখ, ঠোঁট, জিভ, হাত-পায়ের আঙুল, হাড়, পেশি ও ভেতরের অঙ্গগুলোর বিকাশ এখন অনেক দ্রুত চলছে।

অন্যদিকে, আপনার শরীরেও হরমোনের পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন নতুন অভিজ্ঞতা হতে পারে। যেমন—বমিভাব, ক্লান্তি, স্তনে পরিবর্তন, সাদা স্রাব, খাবারের রুচিতে পরিবর্তন কিংবা মুড সুইং। এসব পরিবর্তন গর্ভাবস্থার একটি স্বাভাবিক অংশ।

এই সময়ে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত ফল ও শাকসবজি খাওয়া, আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট সেবন এবং সময়মতো গর্ভকালীন চেকআপ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই লেখায় যা জানবেন
  • ৯ সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি
  • মায়ের শরীরে কী কী পরিবর্তন হয়
  • এই সপ্তাহে কী কী করণীয়
  • সাধারণ লক্ষণ
  • কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
  • বাবার করণীয়
  • প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ
৯ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা এক নজরে
গর্ভকাল
৯ সপ্তাহ
মাস
২ মাস ১ সপ্তাহ
ত্রৈমাসিক
প্রথম ত্রৈমাসিক
বাকি সময়
প্রায় ৩১ সপ্তাহ
শিশুর দৈর্ঘ্য
প্রায় ২২ মিলিমিটার
শিশুর আকার
একটি আঙুরের সমান

এই সপ্তাহে আপনার করণীয়

প্রতিদিন বেশি করে শাকসবজি ও ফলমূল খান

আপনার গর্ভের শিশুটি এখন খুব দ্রুত বেড়ে উঠছে। তার মস্তিষ্ক, হাড়, রক্ত, ত্বক এবং শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তৈরির জন্য প্রতিদিন নানা ধরনের ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রয়োজন হয়। এই পুষ্টিগুলোর অন্যতম ভালো উৎস হলো বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলমূল।

তাই প্রতিদিনের প্রতিটি খাবারের সঙ্গে কিছু না কিছু সবজি বা ফল রাখবেন। সব মিলিয়ে দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার চেষ্টা করবেন।

আপনার খাদ্যতালিকায় যেসব ফলমূল ও শাকসবজি রাখতে পারেন—

  • পালং শাক
  • লাল শাক
  • পুঁইশাক
  • মিষ্টি কুমড়া
  • গাজর
  • টমেটো
  • শসা
  • লাউ
  • পেঁপে (পাকা)
  • আপেল
  • কমলা
  • পেয়ারা
  • কলা

প্রতিদিন একই ধরনের সবজি বা ফল না খেয়ে বিভিন্ন রঙের ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া সহজ হয়।

নিয়মিত হালকা ব্যায়াম চালিয়ে যান

ডাক্তারের কোনো নিষেধ না থাকলে গর্ভাবস্থায় নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা নিরাপদ এবং উপকারী। নিয়মিত ব্যায়াম করলে আপনার শরীর সচল থাকে, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিছুটা কমে, কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি কমতে পারে, মানসিক চাপ কমে, ঘুম ভালো হয় এবং প্রসবের জন্য শরীর প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

আপনি যদি আগে কখনো ব্যায়াম না করে থাকেন, তাহলে খুব ধীরে শুরু করুন। প্রতিদিন ২০–৩০ মিনিট হাঁটা দিয়েও শুরু করা যায়। একাই ব্যায়াম করতে ভালো না লাগলে আপনার স্বামী, পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর সঙ্গে হাঁটতে যেতে পারেন। এতে ব্যায়াম করার আগ্রহও বাড়বে।

তবে নিচের যেকোনো সমস্যা থাকলে ব্যায়াম শুরুর আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন—

  • যোনিপথে রক্তপাত
  • তীব্র পেটব্যথা
  • মাথা ঘোরা
  • শ্বাসকষ্ট
  • উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা

আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট নিয়মিত খাবেন

গর্ভাবস্থার ৯ম সপ্তাহেও আপনার শিশুর মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খাওয়া চালিয়ে যান। এই ট্যাবলেটের উপকারিতা—

  • রক্তশূন্যতার ঝুঁকি কমায়
  • শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে সাহায্য করে
  • নিউরাল টিউব ডিফেক্টসহ কিছু জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে
  • মা ও শিশুর সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

ট্যাবলেট খাওয়ার পর যদি বমিভাব বা পেটের অস্বস্তি হয়, তাহলে কখন খেলে আপনার জন্য বেশি আরামদায়ক হবে, সে বিষয়ে ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করুন।

মনে রাখবেন: ডাক্তারে পরামর্শ ছাড়া কোনো ভিটামিন, হারবাল ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করবেন না।

গর্ভাবস্থার ৯ম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি

গর্ভাবস্থার ৯ম সপ্তাহে শিশুর বৃদ্ধি - Parenting Point

এ সপ্তাহে আপনার গর্ভের ছোট্ট শিশুটি আগের তুলনায় আরও দ্রুত বেড়ে উঠছে। তার দৈর্ঘ্য এখন প্রায় ২২ মিলিমিটার, অর্থাৎ প্রায় একটি আঙুরের সমান। আকারে এখনো ছোট হলেও তার শরীরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তৈরি হওয়ার পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। প্রতিদিনই তার শরীরে নতুন নতুন পরিবর্তন ঘটছে। মুখমণ্ডল আরও স্পষ্ট হচ্ছে, হাত-পায়ের আঙুল আলাদা হতে শুরু করেছে এবং শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গও আরও পরিণত হচ্ছে।

আপনার শিশুটি এখন প্রায় একটি আঙুরের সমান

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও আপনার শিশুটি ছিল একটি ক্ষুদ্র কোষের সমষ্টি। আর এখন সে প্রায় ২.২ সেন্টিমিটার লম্বা। যদিও তার ওজন এখনো খুবই কম, তবুও তার শরীরে অবিশ্বাস্য গতিতে নতুন নতুন কোষ তৈরি হচ্ছে। এই সময় থেকেই শিশুর শরীর ধীরে ধীরে মানুষের মতো আকৃতি নিতে শুরু করে। মাথা এখনো শরীরের তুলনায় কিছুটা বড় হলেও পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে শরীরের অন্যান্য অংশও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

চোখের বিকাশ আরও এগিয়ে যাচ্ছে

৯ম সপ্তাহে শিশুর চোখের গঠন আরও পরিপূর্ণ হতে শুরু করে। এ সময় চোখের পাতাগুলো (Eyelids) প্রায় সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে যায়। চোখের ভেতরের বিভিন্ন অংশ আরও বিকশিত হতে থাকে। আইরিস বা চোখের রঙ নির্ধারণকারী অংশে ধীরে ধীরে রঙের উপাদান জমতে শুরু করে। চোখ দুটো আগের তুলনায় মুখের সঠিক অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসে। যদিও শিশুর চোখ তৈরি হচ্ছে, তবে এখনো সে চোখ খুলতে পারে না। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ চোখের পাতা বন্ধ অবস্থায় থেকেই চোখের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

ঠোঁট, জিভ ও মুখের গঠন আরও স্পষ্ট হচ্ছে

এই সপ্তাহে শিশুর মুখমণ্ডলের পরিবর্তন আরও সহজে বোঝা যায়। এ সময় ওপরের ঠোঁট আরও স্পষ্টভাবে তৈরি হতে থাকে। মুখের ভেতরে ছোট্ট জিভ তৈরি হচ্ছে সাথে জিভে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাদ কোরক (Taste Buds) তৈরি হতে শুরু করেছে। নাক ও চোয়ালের গঠনও আরও সুস্পষ্ট হচ্ছে। যদিও এখনো শিশুটি খাবারের স্বাদ অনুভব করতে পারে না, তবে ভবিষ্যতে খাবারের স্বাদ বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় গঠনগুলো এখন থেকেই তৈরি হতে শুরু করেছে।

হাত-পায়ের আঙুল আলাদা হতে শুরু করেছে

আগের সপ্তাহে হাত-পায়ের শেষ অংশগুলো অনেকটা বৈঠার মতো ছিল। এখন ধীরে ধীরে সেগুলো বদলে যাচ্ছে। হাতের আঙুলগুলো একে অপরের থেকে আলাদা হতে শুরু করে। পায়ের আঙুলের মাঝের খাঁজ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ছোট ছোট আঙুলের আকৃতি বোঝা যায়। কবজি ও গোড়ালির গঠন আরও পরিষ্কার হতে থাকে। যদিও আঙুলগুলো এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি, তবে প্রতিদিনই সেগুলো আরও পরিণত হচ্ছে।

ছোট্ট শরীরে হাড় ও পেশি তৈরি হচ্ছে

শিশুর শরীরের ভেতরে এখন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চলছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাড় তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নরম তরুণাস্থি (Cartilage) ধীরে ধীরে শক্ত হাড়ে রূপ নিতে শুরু করেছে। হাত-পায়ের পেশিগুলোও তৈরি হতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে চলাফেরা করার জন্য প্রয়োজনীয় মাংসপেশির ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। যদিও আপনি এখনো শিশুর নড়াচড়া অনুভব করতে পারবেন না, তবে সে গর্ভের ভেতরে ছোট ছোট নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছে।

শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে

শুধু বাইরের অংশ নয়, শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলোরও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। হৃদ্‌পিণ্ড নিয়মিত স্পন্দিত হচ্ছে এবং শরীরে রক্ত সঞ্চালন করছে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। ফুসফুস আরও পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিডনি ধীরে ধীরে গঠন সম্পন্ন করছে। লিভার ও পরিপাকতন্ত্রের বিকাশও চলতে থাকে। এই অঙ্গগুলো এখনো পুরোপুরি কাজ করার মতো পরিণত হয়নি, তবে জন্মের আগ পর্যন্ত এগুলোর বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

শিশুর জনন অঙ্গও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে

৯ম সপ্তাহে শিশুর প্রজনন অঙ্গের বিকাশও উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে যায়। শিশুর জনন অঙ্গের গঠন আরও স্পষ্ট হতে থাকে। ছেলে বা মেয়ের জনন অঙ্গের প্রাথমিক বিকাশ চলতে থাকে। শরীরের নিচের অংশের গঠন আরও পরিপূর্ণতা পেতে শুরু করেছে। তবে এখনো আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে শিশুটি ছেলে না মেয়ে, তা নির্ভুলভাবে বোঝা সম্ভব নয়। সাধারণত এটি জানতে আরও কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়।

শিশুর হৃদপিণ্ড আরও দক্ষভাবে কাজ করছে

আপনার শিশুর হৃদ্‌পিণ্ড এখন নিয়মিতভাবে স্পন্দিত হচ্ছে এবং শরীরের প্রতিটি অংশে রক্ত পৌঁছে দিচ্ছে। এই রক্তের মাধ্যমেই অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি শিশুর শরীরের প্রতিটি নতুন কোষে পৌঁছে যাচ্ছে। তাই এই সময় মায়ের সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত গর্ভকালীন যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হচ্ছে

৯ম সপ্তাহেও শিশুর মস্তিষ্কের বৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চলতে থাকে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একে অপরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করছে এবং ভবিষ্যতে শেখা, চিন্তা করা, চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা ও অনুভূতি প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় স্নায়ুতন্ত্র ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। এই সময় পর্যাপ্ত ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন-ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ শিশুর সুস্থ মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মায়ের শরীরে যে সব পরিবর্তন ঘটে

গর্ভাবস্থার ৯ম সপ্তাহে আপনার শরীরে হরমোনের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এই হরমোনগুলো গর্ভের শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এগুলোর কারণেই আপনার শরীরে কিছু নতুন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এসব পরিবর্তন  স্বাভাবিক এবং সাময়িক।

স্তনে পরিবর্তন

এই সময় আপনার স্তন ভবিষ্যতে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ফলে স্তনের আকার কিছুটা বড় হতে পারে এবং স্পর্শ করলে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে ব্রা-এর মাপও আগের তুলনায় বড় হয়ে যায়। আরামদায়ক ও সঠিক মাপের ব্রা ব্যবহার করলে অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে। প্রয়োজন হলে গর্ভাবস্থার জন্য তৈরি ম্যাটারনিটি ব্রা ব্যবহার করতে পারেন।

সাদা স্রাব হওয়া স্বাভাবিক

গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে সাদা বা দুধের মতো পাতলা স্রাব কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। এটি সাধারণত স্বাভাবিক এবং এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন—

  • স্রাবে দুর্গন্ধ থাকা
  • হলুদ, সবুজ বা ধূসর রঙের স্রাব
  • যোনিপথে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া
  • স্রাবের সঙ্গে ব্যথা বা অস্বস্তি

এসব লক্ষণ ইনফেকশনের লক্ষণ হতে পারে।

স্বাস্থ্যকর নাস্তা বেছে নিন

এই সময় হঠাৎ ক্ষুধা লাগা বা ক্লান্তির কারণে অনেকেই বিস্কুট, চানাচুর বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খেয়ে ফেলেন। তবে এগুলোর বদলে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো। স্বাস্থ্যকর নাস্তার জন্য রাখতে পারেন—

  • একটি আপেল বা কমলা
  • একটি সেদ্ধ ডিম
  • এক মুঠো বাদাম (ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী)
  • শসা বা গাজরের টুকরা
  • টক দই
  • মৌসুমি ফল

এসব খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে।

দ্বিতীয় গর্ভকালীন চেকআপের প্রস্তুতি নিন

যদি আপনার প্রথম গর্ভকালীন চেকআপ হয়ে থাকে, তাহলে এখন দ্বিতীয় চেকআপের সময় হতে পারে। ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করার আগে আপনার যেসব প্রশ্ন আছে, সেগুলো একটি নোটবুকে বা মোবাইলে লিখে রাখুন। এতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

সাধারণভাবে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে—

  • ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত মাসে একবার চেকআপ করা হয়।
  • ২৮ থেকে ৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি দুই সপ্তাহে একবার।
  • ৩৬ সপ্তাহের পর সাধারণত প্রতি সপ্তাহে একবার চেকআপের প্রয়োজন হয়।

আর যদি এখনো প্রথম গর্ভকালীন চেকআপ না করে থাকেন, তাহলে আর দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

হরমোনের পরিবর্তনের কারণে নানা অনুভূতি হতে পারে

এ সপ্তাহে আপনার আরও যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে সেগুলো হলো—

  • স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্লান্ত লাগা
  • বমি বমি ভাব বা বমি। একে অনেকসময় ‘মর্নিং সিকনেস’ বলে। তবে এই বমি ভাব দিনের যেকোনো সময়েই হতে পারে
  • পেটে অস্বস্তি বা পেট ফাঁপা হয়েছে এমন মনে হওয়া
  • মাথা ব্যথা
  • তীব্র ঘ্রাণশক্তি
  • খাবারের অভ্যাসে লক্ষণীয় পরিবর্তন আসা। হঠাৎ কোনো খাবারে অরুচি কিংবা নতুন কোনো খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখা দিতে পারে। আবার নির্দিষ্ট কিছু খাবারের গন্ধে বমি বমিও লাগতে পারে
  • মুখে অদ্ভুত অথবা ধাতব স্বাদ পাওয়া
  • ঘন ঘন মনমেজাজ বদলানো বা মুড সুইং। এই খুশি, আবার এই মন খারাপ—এমনটা হতে পারে। পাশাপাশি এসময়ে ছোটোখাটো বিষয়ে মন খারাপ লাগা অথবা কান্না করে ফেলার প্রবণতা দেখা দিতে পারে
  • পিরিয়ড বা মাসিকের ব্যথার মতো তলপেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা অনুভব করা
  • মুখে মেছতার মতো বাদামি ও ছোপ ছোপ দাগ পড়া
  • চুল ঘন ও ঝলমলে হওয়া
  • যোনিপথ দিয়ে হালকা রক্তপাত হওয়া। এমন হলে অবশ্যই দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা কোনো মারাত্মক কারণে হয় না। তবে কখনো কখনো এটা গর্ভপাতের একটা লক্ষণ হতে পারে

লক্ষণগুলোর কারণে এখন বেশ অস্বস্তি লাগলেও  আগামী সপ্তাহগুলোতে আপনার একটু একটু করে ভালো লাগা শুরু হতে পারে।

বাবার করণীয়

গর্ভাবস্থার এই সময়টাতে মায়ের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হতে পারে। একজন সঙ্গী হিসেবে আপনার সহযোগিতা মায়ের জন্য অনেক বড় শক্তি হতে পারে। ছোট ছোট যত্নও তাকে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস এনে দিতে পারে।

পরবর্তী গর্ভকালীন চেকআপের প্রস্তুতি নিন

এ সময় অনেকের দ্বিতীয় গর্ভকালীন চেকআপের সময় হয়ে আসে। যদি এখনো প্রথম চেকআপ না হয়ে থাকে, তাহলে আর দেরি না করে ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন। চেকআপের আগে প্রয়োজনীয় রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন এবং যেসব প্রশ্ন ডাক্তারকে করতে চান সেগুলো লিখে রাখুন। এতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

ডাক্তারের জন্য প্রশ্নের তালিকা তৈরি করুন

গর্ভাবস্থা নিয়ে আপনাদের মনে অনেক প্রশ্ন আসতেই পারে। যেমন—

  • কোন খাবার বেশি খাওয়া উচিত?
  • কোন ব্যায়াম নিরাপদ?
  • কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?
  • পরবর্তী আল্ট্রাসনোগ্রাম বা পরীক্ষা কখন করতে হবে?

এসব প্রশ্ন আগে থেকেই লিখে রাখুন, যাতে চেকআপের সময় সহজে আলোচনা করা যায়।

সাদা স্রাব নিয়ে অযথা ভয় পাবেন না

গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকের তুলনায় সাদা স্রাব কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। এটি সাধারণত হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক।

তবে যদি স্রাবে—

  • দুর্গন্ধ থাকে,
  • হলুদ বা সবুজ রঙ হয়,
  • চুলকানি বা জ্বালাপোড়া থাকে,

তাহলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

একসঙ্গে ব্যায়াম করুন

নিয়মিত হালকা ব্যায়াম গর্ভবতী মায়ের জন্য উপকারী। আপনি চাইলে একসঙ্গে হাঁটতে যেতে পারেন বা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ ব্যায়াম করতে পারেন।

এতে—

  • মায়ের ব্যায়ামের আগ্রহ বাড়বে,
  • ক্লান্তি কিছুটা কমবে,
  • আপনাদের একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও তৈরি হবে।

বমিভাব বাড়ায় এমন খাবার এড়িয়ে চলুন

যেসব খাবার বা গন্ধে আপনার সঙ্গীর বমিভাব বেড়ে যায়, সেগুলো কিছুদিনের জন্য বাসায় না আনার চেষ্টা করুন। রান্নার সময় তীব্র গন্ধ হলে জানালা খুলে দিন বা প্রয়োজন হলে রান্নার দায়িত্ব কিছুদিন নিজেরা ভাগ করে নিন।

মানসিকভাবে পাশে থাকুন

গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মুড সুইং হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কখনো তিনি আনন্দিত থাকবেন, আবার সামান্য কারণেও মন খারাপ হতে পারে। এ সময় ধৈর্য ধরে তার কথা শুনুন, তাকে দোষারোপ করবেন না, প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নিতে উৎসাহ দিন, তাকে আশ্বস্ত করুন যে আপনি সবসময় তার পাশে আছেন।

হবু মায়েদের জন্য স্বাস্থ্য পরামর্শ

সাধারণ জিজ্ঞাসা

৯ম সপ্তাহে গর্ভের শিশুর দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ মিলিমিটার হয়, যা প্রায় একটি আঙুরের সমান।

 

এই সময় শিশুর চোখের পাতা, ঠোঁট, জিভ, হাত-পায়ের আঙুল, হাড়, পেশি এবং হার্ট, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্র আরও বিকশিত হতে থাকে।

হ্যাঁ। প্রথম ত্রৈমাসিকে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে বমিভাব বা বমি হওয়া খুবই সাধারণ। সাধারণত কয়েক সপ্তাহ পর এটি ধীরে ধীরে কমে আসে।

চিকিৎসকের অনুমতি থাকলে হালকা হাঁটা, প্রেগন্যান্সি-সেফ স্ট্রেচিং বা অন্যান্য নিরাপদ ব্যায়াম করা যেতে পারে। নতুন কোনো ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, দুধ, ডিম, মাছ এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট নিয়মিত সেবন করা প্রয়োজন।

যদি যোনিপথে রক্তপাত, তীব্র তলপেট ব্যথা, বারবার বমি হয়ে পানি বা খাবার ধরে রাখতে না পারা, জ্বর, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।